শিশু প্রকাশ,পাবনাঃ আমরা নীচু জাত আছি, সকলেই ঘৃণা করে। চলতে ফিরতে অনেক সমস্যা। বাবা-মা, সমাজের অন্যান্যরা আমাকে কলেজে লেখাপড়া করতে দিতে ভয় পায়। নীচু জাতের কারণে উঁচু জাতের মানুষগুলো মনে করে আমাদের কোন সন্মান নেই। অনেকেই সুযোগ নিতে চায়। কলেজে ভর্তি হলেও শেষ পর্যন্ত পাশ দিতে পারব কি-না ? এই সংশয় ব্যক্ত করল ঈশ্বরদী মহিলা কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক একাদশ শ্রেণীর ছাত্রী সুইপার কন্যা সীমা। কলেজের একটি শ্রেণীকক্ষে বসে শিশু সাংবাদিকদের সীমা তার সমস্যা ও কষ্টের কথাগুলো এভাবেই ব্যক্ত করছিল। বৃটিশ আমলে ঈশ্বরদীতে রেলওয়ে জংশন এবং পরে পাকশীতে রেলওয়ের বিভাগীয় সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয় । এই সময়ে ঈশ্বরদীতে সুইপার কলোনী গড়ে উঠে। দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও এই প্রথম ঈশ্বরদীতে সুইপার কন্যা সীমা সমাজ ও পরিবারের নানা বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজে পদার্পণ করেছে। সীমা ঈশ্বরদী মহিলা কলেজে মানবিক শাখায় একাদশ শ্রেণীতে পড়ছে। বয়স ষোল পেরিয়ে সীমা এখন সতেরোতে পা দিলেও চেহারা দেখে বোঝা গেল অভাব-অনটনের কারণে অপুষ্টিতে ভুগছে। দরিনারিচা সুইপার কলোনীতে গাদাগাদি-ঠাসাঠাসি পরিবেশে সীমাদের বসবাস। পাশেই চামড়ার গুদাম ও নোংড়া-আবর্জনার ভাগাড়ের কারণে এলাকার পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর। অধিকার বঞ্চিত শিশু সীমা ৭ বোনের মধ্যে সবার ছোট। বড় ৫ বোনের শিশু অবস্থায়ই বিয়ে হয়েছে। বোনদের মধ্যে ১জন সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করলেও আর কেউ পড়েনি। একমাত্র ভাই ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছে। বাব কৃষ্ণা রায় রেলে চাকরী করলেও এখন অবসরপ্রাপ্ত। ভাইটিও বেকার। দু’টি ছোট্ট ঘরে সীমার গাদাগাদি করে বসবাস করে। টেবিল-চেয়ার তো দূরের কথা বাড়িতে পড়ালেখার কোন পরিবেশ নেই। ঘিঞ্জি পরিবেশে সবসময় কোলাহল-চেঁচামেচি লেগেই থাকে। এরই মাঝে সীমা বিছানায় বসে দৈনন্দিন ক্লাশের পড়ার আপ্রাণ চেষ্ঠা করে। সীমা জানায়, টাকার অভাবে প্রাইভেট পড়তে না পারায় এবং পড়ালেখার পরিবেশ না থাকায় এসএসসিতে ২.৬৯ পয়েন্ট পেয়েছে। কলেজে ভর্তির পর ৬ ম্াস অতিবাহিত হলেও এখনও সব বই কেনা হয়নি। সীমা আরও জানায়, ইংরেজী ও কম্পিউটার প্রাইভেট পড়া দরকার, কিন্তু টাকার জন্য পড়তে পারছিনা। কলেজে ১ থেকে ৫ তারিখের মধ্যে বেতন দেয়ার নিয়ম। কিন্তু সীমা কোন মাসেই নির্ধারিত সময়ে বেতন দিতে পারে না । প্রতি মাসেই ৫ টাকা জরিমানা সহ বেতন দিতে হয়। জরিমানা সীমার কাছে বোঝার উপর শাকের আাঁটি। উপবৃত্তির জন্য তালিকাভূক্ত হলেও এখন পর্যন্ত টাকা পায়নি। ক্লাশের সহপাঠিরা রিক্সায় যাতায়াত করলেও সীমা হেঁটেই কলেজে যাতায়াত করে। মৌলিক শিশু অধিকার বঞ্চিত সীমার উচ্চ আশা প্রসংগে জিজ্ঞেস করলে সীমাই উল্টো প্রশ্ন করে আমাদের মতো ছোট জাতের কি উচ্চ আশা হওয়া উচিত? সীমা জানায়, এক সময় ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। অভাবের কারণে সে স্বপ্ন অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়েছে। তাই এখন আর কোন স্বপ্ন দেখি না। তবে, সীমার ডিগ্রী পাশ করার ইচ্ছে আছে। সীমা জানায়, ভবিষ্যতে কি করব কি হবে এসব নিয়ে ভাবছি না। ভাল কোন চাকরি তো আমাদের হবে না। সমাজের লোকজন বেশী লেখাপড়াকে ভাল চোখে দ্যাখে না বলে। সীমার বাবা ও মাকে তাদের সমাজের লোকজন এসে বলে, এতদূর পড়িয়ে লাভ কি? তাঁদের আশংকা যদি মেয়ে নষ্ট হয়ে যায় বা পালিয়ে যায়। আর্থিক ও সামাজিক উভয় কারণেই লেখাপড়া যেকোন সময় বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশংকায় সীমা সবসময় শংকিত। তবে, সীমা কলেজে ভর্তি হওয়ার পর তাদের সম্প্রদায়ের কেউ কেউ এখন ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। সীমা সংসারের কাজে মাকে সাহায্য করার পাশাপশি এলাকার ছোট ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ায় সবসময় সাহায্য করে। অংক কষে , পড়া দাগিয়ে দেয়াসহ এলাকার ছেলেময়েরা কিভাবে লেখাপড়া করলে ভাল হওয়া যাবে এ ব্যাপারে সাহায্য করছে। সংস্কৃতি চর্চ্চায়ও সীমা পারদর্শী। নিজেদের সমাজের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নাচ-গান করে। তবে, বাইরের কোন অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার সুযোগ পায়না। বড় হয়ে যাওয়ার কারণে বাবা-মা এখন নাচ-গান করতে বাধা দেয় বলে জানায়। সীমা তাদের সমাজে বাল্য বিবাহের প্রথার চরম বিরোধী। তাদের সমাজে ১১-১৪ বছরের মধ্যেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেয়। বাল্য বিবাহ প্রসংগে সীমা মনে করে ছোট বয়সে বিয়ে দেয়া ভুল। এখন যাদের লেখাপড়া করার সময় তােেদর অল্প বয়সে বিয়ে দিলে সংসারের এতো বড় দায়িত্ব কি আইনত শিশু মেয়েরা পালন করতে পারবে ? ছোট মেয়েদের বিয়ে না দেয়ার জন্য সমাজের লোকদের বোঝানোর চেষ্টা করলেও কোন লাভ হয়না বলে সীমা জানায়। উপরোন্ত বকা খেতে হয়। ঈশ্বরদীর ৪টি কলোনীতে ৯৩টি সুইপার পরিবার বসবাস করে। এক সময়ে রেলওয়েতে বেশীরভাগ সুইপার চাকরী করলেও এখন মাত্র ১১টি পরিবারের লোক চাকুরিরত। পৌরসভাসহ স্থানীয় ক্লিনিক-হাসপাতালে যারা চাকরি করেন তাদের বেতন দিয়ে সংসার চলে না। একসময়ে সার্ভিস পায়খানার প্রচলন ছিল। এসময় মলমূত্র পরিস্কার করে সুইপাররা মোটামুটিভাবে জীবনযাত্রা নির্বাহ করতো। এখন সর্বত্রই স্যানিটারী ল্যাট্রিন। আর্থিক, সামাজিক , পরিবেশসহ সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত ঈশ্বরদীর সুইপার সমাজ। তদুপরি এই সমাজের লোকজন ক্রমেই সচেতন হচ্ছে। তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে সীমার কলেজে পদার্পনের মাধ্যমে। এই ৮৭ জন শিশু নিয়মিত স্কুলে যাতায়াত করছে। আগে স্কুল থেকে ঝড়ে পড়ার হার বেশী থাকলেও এখন অনেক কম। আগামী বছর আরও ২ জন সুইপার শিশু কলেজে ভর্তি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সুইপার কলোনীর শিশুদের শিক্ষা ক্ষেত্রে অগ্রগতির জন্য আর্থিক, সামাজিক ও পরিবেশগত প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে সরকারের পাশাপাশি সমাজের উঁচু জাতের সকলের এগিয়ে আশা উচিত। তা-নাহলে সুইপার কলোনীর সীমার মতো শিশুরা একবিংশ শতাব্দির ডিজিটাল বাংলাদেশে আর কখনও কোন স্বপ্নই দেখবে না।## রিপোর্ট তৈরি করেছেন: অন্তরা, অনন্যা, সূধা, রিদি, অর্পিতা, অনিক, সৌরভ, আসিফ,অমিত, আবির।








