শিশু প্রকাশ (গাজীপুর): 'যে বয়সে আমার বিয়ে হয়েছে, সে বয়সে আমার সন্তানদের বিয়ে হতে দেব না।। প্রাপ্ত বয়স না হওয়া পর্যন্ত আমার মত পরিণতির দিকে ঠেলে দিব না। আর দুটি বছর আগে যখন আমি নবম শ্রেণীতে পড়তাম তখন আমার গ্রামে শিশু বিয়ের সচেতনতার ওপর কার্যক্রম চালু হলে হয়ত আমি এরূপ বয়সে বিয়ের শিকার হতাম না।' নিজ সনত্দানেরর বিষয়ে সিদ্ধানত্দের কথা এভাবেই বলছিলেন গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মাওনা ইউনিয়নের শিরিষগুঁড়ি গ্রামের বাল্য বিয়ের শিকার সুমী (১৫) আক্তার ।
বাল্য বিয়ের আরেক শিকার একই গ্রামের পারভীন আক্তার (১৫) জানান, সৌন্দর্য কোনো মানুষের দোষের না। এটি সৃষ্টিকর্তার দান। শিশু বিবাহের ব্যপারে আমার বাবা মা সচেতন। এলাকার খারাপ ছেলে মেয়েদের কারণে আমার বাবা মা আমাকে গত বছর নবম শেণীতে পড়াকালীন বিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। যৌন হয়রানি বাল্য বিয়ের প্রবণতার আরেকটি কারণ। এখানে শুধু মা বাবাকেই সচেতন হলে হবে না। সমাজের সকল মানুষকে সচেতন এবং নারী পুরুষের প্রতি সমান শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। শ্রেণী কক্ষের ছেলে মেয়ে পরস্পরকে সমান মর্যাদা দিতে হবে।
শিরিষগুঁড়ি গ্রাম বাল্য বিয়েমুক্ত ঘোষণা করার অনুষ্ঠানে এসে অভিমত ব্যক্ত করার সময় বাল্য বিয়ের শিকার একাধিক বাবা মায়েরা আলাদাভাবে তাদের বাল্য বিয়ের পরিণতির প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করেন।
শিরিষগুঁড়ি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল জলিল জানান, গত পাঁচ বছর ধরে এ গ্রামে প্রতি বছর কমপক্ষে তিনটি বাল্য বিয়ে হত। এরা সবাই এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। সচেতনতার অভাবে তাদের বিয়ে বন্ধ করা যেত না। একই গ্রামের শাহনাজ আক্তার, শারমিন নাহার ও জাহানারা বেগম জানান, গত ৭ মাস আগে এ গ্রামের সপ্তম শ্রেণী পড়ুয়া একজন শিশুকে বাল্য বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের কারণে ওই শিশুটি অবশেষে আত্নহত্যা করেছে।
মাওনা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমীর হামজা শিশু প্রকাশকে জানান, শিরিষগুঁড়ি গ্রামে প্রায় প্রতিটি বাড়িতে কয়েকটি বাড়ির লোকদের নিয়ে প্রতিমাসে কমপক্ষে একটি করে সচেতনতামূলক সভা করা হত। একটানা গত ৬ মাস এরকম কর্মসুচীর মাধ্যমে শিশু বিবাহের খারাপ দিকগুলো তাদের সামনে তুলে ধরা হত। এভাবে পুরো শিরিষগুঁড়ি গ্রামের প্রাপ্ত বয়স্ক সকলেই এ বিষয়ে জ্ঞান লাভ করে। পরে তারা নিজেরাই প্রকাশ্যে এলাকায় একাধিক সভা করে শিশু বিয়ে না করানোর অঙ্গীকার করে। আর এ অঙ্গীকারের মাধ্যমেই শিরিষগুঁড়ি আজ শিশু বিবাহমুক্ত গ্রাম।
২০১১ সালের ২০ মার্চ রোববার সন্ধ্যায় মাওনা ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে ও পস্ন্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের সহযোগিতায় শিরিষগুঁড়ি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এ গ্রামটিকে শিশু বিবাহমুক্ত ঘোষণা করা হয়।
মাওনা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমীর হামজার সভাপতিত্বে ও ইউপি সদস্য কামরুল আলম দুদুর পরিচালনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দেবাশীষ নাগ শিরিষগুঁড়ি গ্রাম শিশু বিবাহমুক্ত ঘোষণা করেন। এসময় তিনি ওই এলাকায় শিশু বিবাহমুক্ত গ্রামের সাইনবোর্ড উম্মোচন করেন।
ইউনিসেফ ও এমএমসির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত শিশু প্রকাশ গাজীপুরের শিশু সাংবাদিক মোছাদ্দেক, নাজমুল, শিশির, পারভীন, আইরিন, শারমিন, হৃদয়, মারিয়া, সাকিব ও মাজহারুল ইসলাম রিপোর্টটি তৈরী করেছে।
আপডেট-ফেব্রম্নয়ারী ২০১০








